ইন্দ্রপ্রস্থ
প্রথমে বন্দনা করি স্বরস্বতী নদী
আর কিছু স্মৃতিচিহ্ন যমুনা অবধি
দিকের কি পরিচয় দেবো মহাজন
পান্ডব নগর ছিলো, খান্ডব দহন
ছিলো সর্প, ছিলো স্রোত আদি বদ্রি পার
রচনা মৌখিক লিখি সত্য ঘটনার
যার যা বলার বলো শুনি মন দিয়ে
প্রকৃত প্রস্তাবে আমি পয়ার লিখিয়ে ।
ইন্দ্রপ্রস্থ নামে এক নগরী গজব
ময়দানবের ইচ্ছায় পায় অবয়ব
প্রথমে বন্দনা করি স্বরস্বতী নদী, আর কিছু স্মৃতিচিহ্ন যমুনা অবধি। দিকের কি পরিচয় দেবো মহাজন, পান্ডব নগর ছিলো, খান্ডব দহন। ছিলো সর্প, ছিলো স্রোত আদি বদ্রি পার, রচনা মৌখিক লিখি সত্য ঘটনার। যার যা বলার বলো শুনি মন দিয়ে, প্রকৃত প্রস্তাবে আমি পয়ার লিখিয়ে।
ইন্দ্রপ্রস্থ নামে এক নগরী গজব, ময়দানবের ইচ্ছায় পায় অবয়ব। পাণ্ডব প্রধান বসেন সভায় তখন, দেবের নগরী যেন, সুন্দর ভুবন। যুধিষ্ঠির ধর্মরাজা করেন শাসন, রাজসূয় যজ্ঞ হয়, দেখে ত্রিভুবন। কত রাজা আসে যায় ভেট করি হাতে, কৌরব হিংসায় জ্বলে আপন ভ্রাতে। मणिमय সভাঘরে কী অপূর্ব শোভা, ভুবনবিজয়ী বীর পাণ্ডুর বিভা। কিন্তু হায়! সব সুখ নাহি থাকে চির, পাশা খেলা হলো শেষে সর্বনাশা तीर। রাজ্যহারা পাণ্ডবেরা যায় বনবাসে, ইন্দ্রপ্রস্থ কাঁদে শুধু দীর্ঘশ্বাসে। নগরী হারায় শোভা, হারায় গৌরব, ঢেকে যায় ইতিহাসে পাণ্ডব-কৌরব। বহু যুগ পার হয়, রাজা আসে যায়, পাটলিপুত্র শোভে মগধের গায়। মৌর্য আর গুপ্ত বংশ করে আস্ফালন, ইন্দ্রপ্রস্থ পড়ে থাকে করিয়া রোদন। শুধু ঢিবি, শুধু ধুলো, ভাঙা ইঁট কাঁথি, অতীতের ছায়া ফেরে দিবস ও রাতি। কুরুক্ষেত্র হতে বায়ু আসে কাঁদিয়া, পুরাতন কথা সব যায় জানাইয়া। যমুনার জল শুধু বহি চলে যায়, কালের সাক্ষী হয়ে নীরবেতে গায়। কত শত বর্ষ কাটে বিস্মৃতির কোলে, কে রাখে খবর আর কি ঘটিয়া চলে। অষ্টম শতকে আসে নতুন প্রভাত, তোমার বংশের রাজা করেন বরাত। অনঙ্গপাল তোমার নামেতে নৃপতি, গড়িলেন এ নগরী দিয়া বহু মতি। ‘ধিল্লিকা’ নগরী নাম লোকে মুখে বলে, সেই হতে ‘দিল্লি’ নাম ভুবনমণ্ডলে। লাল কোট নামে দুর্গ প্রাচীরেতে ঘেরা, শত্রুর ভয়েতে কাঁপে বসুন্ধরা। পাথরে পাথর গাঁথা, বুরুজ বিশাল, দিল্লির প্রথম রূপ ধরে চিরকাল। মেহরৌলি মাঝে লৌহ স্তম্ভ এক, গুপ্তযুগের কীর্তি, দেখে অবাক লোক। অনঙ্গপাল মনেতে পাইলেন ভয়, যদি খুঁটি আলগা হয়, কি জানি কি হয়! খুঁটি উপাড়িতে গেল পাতাল অবধি, নাগরাজ বাসুকীর রক্ত বহে নদী। ‘কিল্লি তো ঢিল্লি ভই’ লোকে মুখে বলে, রাজ্য হবে টলমল এই ভূমণ্ডলে। সেই হতে টলমল তোমার শাসন, ইতিহাসে লেখে সব যত কবিগণ। আবার একাদশ শতকে নৃপতি, অনঙ্গপাল দ্বিতীয়, সুশাসক অতি। রাজ্য পুনঃ করিলেন তিনি সুস্থাপন, নগরে বাড়িল শোভা, প্রজাদের মন। গড়িলেন সরোবর सूरजकुण्ड নাম, জলের অভাবে পূর্ণ হয় মনস্কাম। মন্দির উঠিল কত, দেবের নিবাস, বাণিজ্যে বাড়িল শহরের বিশ্বাস। বণিকেরা আনে ধন দূর দেশ হতে, প্রজারা আনন্দে থাকে আপন গৃহেতে। যোগমায়া মন্দিরের করেন নির্মাণ, আজিও সে কীর্তি গায় যত পুণ্যবান। কত শত বর্ষ ধরে তোমার শাসন, দিল্লিকে সাজায়ে রাখে দিয়ে নিজ মন। তোমার প্রতাপ ধীরে হতে থাকে ক্ষীণ, নিয়তির খেলা বোঝা বড়ই কঠিন। দৌহিত্র আসে তার চৌহান বংশের, শুরু হবে নয়া পাঠ ইতিহাসের। পৃথ্বীরাজের কথা আসিব বর্ণনে, আপাতত কথা শেষ তোমার শাসনে। সুলতানী যুগের আগে এই বিবরণ, মন দিয়া শোন সবে যত সভ্যজন।
তোমার বংশের রাজা অনঙ্গপাল নাম, গড়িলেন ধিল্লিকা নগরী, শ্রেষ্ঠ ধাম। সে নগরের চৌহদ্দি করিব বর্ণন, মন দিয়া শোন সবে যত সভ্যজন। ইন্দ্রপ্রস্থ ছিল শুধু ঢিবির আকার, তার কাছে রাজা দেশ করেন বিস্তার। পাহাড়ের কোলে রাজা গড়েন নগরী, নাম ‘লাল কোট’ তার, রূপে মনোহরী। মেহরৌলি নামে আজ যে স্থান বিরাজে, তোমার শাসনকেন্দ্র ছিল তার মাঝে। এই ছিল রাজধানী, রাজ্যের হৃদয়, যেথা হতে হয় সব ভয়ের বিলয়। পূর্ব দিকে বহি চলে যমুনা মহান, রাজ্যের সীমানা সে যে করিয়াছে দান। নদীর কিনারা ধরে যতদূর যাওয়া যায়, সবই অনঙ্গপালের রাজ্যের ছায়ায়। ঘাটে বাঁধা নৌকা, চলে বাণিজ্য ব্যাপার, নদীই সীমানা, তারে কে হইবে পার! জলপথে চলে আদান-প্রদান যত, যমুনার তীরে গ্রাম ছিল শত শত। উর্বর পলিমাটি, শস্যেতে বিপুল, প্রজারা আনন্দে থাকে ভরি নিজ কুল। নদীর পশ্চিমে ছিল নগরীর বাস, পূবের সীমানা ছিল যমুনার পাশ। পশ্চিমে আরাবল্লী, পাথরের প্রাচীর, ঢাল হয়ে রাখে দেশ, নির্ভীক শরীর। প্রকৃতির গড়া দুর্গ, সে এক বিশাল, রাজ্যের রক্ষক হয়ে আছে চিরকাল। এই শৈলমালা ঘিরি দক্ষিণ অবধি, বহে কত ছোট ঝর্ণা, নামে নিরবধি। ঘন বন ছিল সেথা, শ্বাপদ সকল, মানুষের নাহি চলে সাধ্য ও বল। এই শৈলশ্রেণী ছিল পশ্চিমের সীমা, অভেদ্য, অজেয় তার অসীম মহিমা। খনিজ সম্পদে পূর্ণ পাহাড়ের বুক, প্রজাদের নাহি ছিল কোনদিন দুখ। পাথর কাটিয়া গড়ে প্রাসাদ, দেওয়াল, তোমার কীর্তিগাথা রবে চিরকাল। দক্ষিণেও সেই শৈল গিয়াছে নামিয়া, অঞ্চল রেখেছে নিজ নিয়ন্ত্রণে আনিয়া। সূরযকুণ্ড নামে বিশাল জলাশয়, তোমার কীর্তির কথা আজও লোকে কয়। অনঙ্গপুর বাঁধ, জলের আধার, শুষ্ক অঞ্চলেতে আনে বারিষের ধার। অসোলার ভাট্টি ঘিরে বন্য এলাকা, সেই অব্দি রাজ্যের সীমানা যে আঁকা। গ্রাম আর বনভূমি মিলিমিশে রয়, দক্ষিণের সীমা এই পরিচিত হয়। সেই সীমা ছাড়িলেই অন্য রাজ্য আসে, তাই সেথা প্রহরী রহে বারো মাসে। উত্তরে বিস্তৃত মাঠ, সীমা যায় দেখা, কোথাও বা গ্রাম, কোথাও বন্যতার রেখা। আজকের ‘রিজ’ যাহা, শৈলের শেষ ভাগ, তোমার রাজ্যের শিরে পরিয়াছে পাগ। সেই শৈল ছেড়ে দিলে সমতল ভূমি, কৃষকের লাঙলেতে সোনা ফলে চুমি। নগরের কাছে ছিল শস্যের ক্ষেত, কৃষকের শ্রমে অন্ন আসিত কত! কাঁটা ঝোপ, কিঙ্কর আর শুকনো মাটি, এই নিয়ে ছিল দিল্লির পরিপাটি। ছোট ছোট জনপদ নগরের পাশে, রাজার আশ্রয়ে তারা সুখেতে নিবাসে। সীমানা বিশাল নয়, নহে অগণন, তবু ছিল আপনার দৃঢ় এক গড়ন। নদী আর পর্বতেতে ঘেরা এক দেশ, এই ছিল ধিল্লিকার সীমার নির্দেশ। এই ছিল ধিল্লিকার ভৌগোলিক রূপ, তোমার শাসনে গড়া শহর অপরূপ। পাহাড়, নদী ও বন করিয়া আশ্রয়, গড়েছিলে রাজধানী নির্ভীক, নির্ভয়। অনঙ্গপালের কথা কহিনু বিস্তারি, দিল্লির সীমানা মনে লইয়ো বিচারি। এর পরে কত রাজা আসিবে যাইবে, দিল্লির আকার শুধু বাড়িতে থাকিবে।
------------------------------------------
তোমার বংশের কথা ইতি হলো শেষ,
চৌহান বংশের রাজা শাসেন এ দেশ। অজমের অধিপতি, দিল্লির সম্রাট, পৃথ্বীরাজ চৌহান, যাঁর বিশাল ললাট। বীরত্বে তুলনা নাই, রূপে মনোহর, শত্রু কাঁপে যাঁর নামে কাঁপে থরথর। দোর্দণ্ড প্রতাপে শাসে আপন ভুবন, কবি চাঁদ বরদাই যাঁর প্রিয় সখাজন। দিল্লির প্রাচীর ঘিরে বসেছে প্রহরী, শান্তিতে ঘুমায় যত নগরীর নর-নারী। সবার মুখেতে এক চৌহানের নাম, হিন্দুস্থানের শেষ গৌরব ও ধাম। যুদ্ধ আর শান্তিতে সমান যাঁর গতি, অশ্বশালে লক্ষ অশ্ব, গজে সেনাপতি। কিন্তু বিধি বাম, ছিল প্রতিবেশী এক, কনৌজের অধিপতি, রাজা জয়চাঁদ দেখ। জয়চাঁদ নৃপতির এক কন্যা ছিল, সংযুক্তা নামেতে সে ভুবন মাতাইলো। রূপে যেন অপ্সরী, গুণে সরস্বতী, পৃথ্বীরাজের প্রেমে মজিয়াছে অতি। চিত্রপটে হেরি বীরের মোহন মূরতি, মনে মনে পতি বলি করিল আরতি। কিন্তু জয়চাঁদ মনে পোষে অভিমান, চৌহানকে নাহি দিবে কন্যার সম্মান। আয়োজন করে রাজা স্বয়ম্বর সভা, দিকে দিকে হতে আসে রাজাদের বিভা। সকলেরে নিমন্ত্রিল, শুধু এক বাদে, পৃথ্বীরে করিল ঘৃণা বিষম বিবাদে। দ্বারপাল রূপে তাঁর মূর্তি গড়াইয়া, দুয়ারে রাখিল রাজা উপহাসিয়া। সংযুক্তা শুনিয়া সব হইল আকুল, চোখের জলেতে ভাসে যমুনার কূল। হাতেতে বরণমালা, সভায় আসিল, একে একে সব রাজা নিরখিয়া গেল। নাহি হেরি প্রাণনাথে কাঁদে মনে মন, সহসা দেখিল দ্বারে মূরতি তখন। সেই মূর্ত্তি গলে কন্যা দিল বরমাল্য, স্বয়ম্বর সভা জুড়ে উঠিল শল্য। এমন সময়ে দেখ কি হয় ঘটনা, পৃথ্বীরাজ নিজে আসে করিয়া ঘোষণা। ঝড়ের বেগেতে আসি সভায় প্রবেশিল, সংযুক্তারে অশ্বে তুলি হরিয়া চলিল। জয়চাঁদ সেনাপতি পিছে পিছে ধায়, কিন্তু চৌহানের সাথে কে আঁটিতে পায়! তীরবৃষ্টি করি বীর পথ করে সাফ, অপমানে জয়চাঁদ করে বিলাপ। এই অপমানে রাজা বুদ্ধি হারাইল, গজনীর অধিপতি ঘুরীকে ডাকিল। মহম্মদ ঘুরী আগে হেরেছিল রণ, পৃথ্বীরাজের হাতে পেয়েছিল ছাড়ন। তরাইনের মাঠে হয়েছিল সে খেলা, হিন্দু সেনার হাতে তুর্কিদের অবহেলা। ঘুরী হেরে গিয়ে প্রাণে বেঁচে ফিরে যায়, পৃথ্বীরাজ ক্ষমা করি দেখায় দয়ায়। সেই ঘুরী এবে এল জয়চাঁদের ডাকে, প্রতিশোধ নিতে চাহে ঝাঁকে ও ঝাঁকে। সঙ্গেতে লক্ষ সেনা, ঝলসায় কৃপাণ, দিল্লির দিকেতে ধায়, করিয়া সন্ধান। পৃথ্বীরাজ প্রেমানন্দে আছিল মগন, সংযুক্তা লইয়া কাটে দিবস-রজন। সহসা শুনিল ঘুরী এসেছে আবার, সঙ্গেতে জয়চাঁদ, দেশের অঙ্গার। রাজপুত রাজাদের পাঠাল লিখন, ‘এক হও সবে মিলি, বাঁচাও এ জীবন’। কিন্তু কেহ না শুনিল, অহংকারে মাতি, পুরাতন শত্রুতা মনে জ্বালে বাতি। একা চৌহান রাজা সাজিল সমরে, লক্ষ সেনা লয়ে গেল তরাইন প্রান্তরে। প্রথম দিবসে যুদ্ধ ঘোরতর হয়, রাজপুত বিক্রমেতে তুর্কি পায় ভয়। কিন্তু ঘুরী ছিল অতি শঠ ও চতুর, রাত্রি শেষে ছল করি আক্রমণ করে দূর। ভোরের আলোতে যবে সেনারা ঘুমায়ে, আক্রমণ করিল সে চতুর্দিক ঘায়ে। অপ্রস্তুত হিন্দু সেনা ছত্রভঙ্গ হলো, পৃথ্বীরাজ একা তবু যুদ্ধ না ছাড়িল। হাতির উপরে বসি চালায় সংগ্রাম, অগণিত শত্রু কাটি করিল নিষ্কাম। কিন্তু শেষ রক্ষা নাহি হলো বিধাতার, বন্দী হলো চৌহান, বীর অবতার। বন্দী করি তারে ঘুরী দেশে লয়ে যায়, দুই চক্ষু উপাড়িয়া কষ্ট শুধু দেয়। তবু বীর নাহি নোয়ায় আপন মস্তক, ছিল সাথে চাঁদ কবি, বন্ধু ও পাবক। সেথায় ঘটিল এক শেষ ইতিহাস, শব্দভেদী বাণে বীর পুরাইল আশ। ঘুরীকে বধিয়া নিজে ত্যজিল পরাণ, হিন্দুস্থানের রবি হলো অবসান। সেই হতে দিল্লিতে আঁধার নামিল, বহু শত বর্ষ দেশ পরাধীন ছিল। পৃথ্বীরাজের কথা লোকে নাহি ভোলে, শেষ স্বাধীন রাজার নাম মুখে মুখে বলে।
Comments
Post a Comment